রবিবার, ২৮ নভেম্বর ২০২১, ০২:৫৬ পূর্বাহ্ন
শিরোনাম :
গাইবান্ধা জেলা শিল্পকলা একাডেমীর নির্বাচন সম্পন্ন গাইবান্ধায় যুব ইউনিয়নের জেলা সম্মেলন অনুষ্ঠিত মিথ্যা মামলা প্রত্যাহারের দাবিতে গাইবান্ধায় সিপিবির বিক্ষোভ মিছিল প্রেসক্লাব গাইবান্ধার অভিষেক ও প্রীতিভোজ অনুষ্ঠিত গাইবান্ধায় পুলিশে নিয়োগ পরীক্ষার ফল প্রকাশ খালেদা জিয়ার নিঃশর্ত মুক্তি এবং চিকিৎসার দাবিতে বিক্ষোভ গাইবান্ধায় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকদের মাসিক সমন্বয় সভা অনুষ্ঠিত মহান রুশ বিপ্লব ও পার্টির ৪১তম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীর ডাক মামলা প্রত্যাহারের দাবিতে গাইবান্ধায় কমিউনিস্ট পার্টি বিক্ষোভ গোবিন্দগঞ্জ সড়কে সকালেই প্রাণগেল ৬ জনের

সাপ্তাহিক বিচিত্রা : এক সময়ের জনপ্রিয় সাপ্তাহিক

রূপম রশীদ
  • প্রকাশের সময় : বুধবার, ১৮ আগস্ট, ২০২১
  • ২৬৫
সাপ্তাহিক বিচিত্রা বাংলাদেশের একটি অধুনালুপ্ত সাপ্তাহিক পত্রিকা (বিচিত্রার প্রথম সংখ্যা প্রকাশিত হয় ১৯৭২ সালের ১৮ মে এবং শেষ সংখ্যা প্রকাশিত হয় ১৯৯৭ সালের ৩১ অক্টোবর)। ১৯৭২ খ্রিষ্টাব্দে দৈনিক বাংলা পত্রিকার সহযোগী প্রকাশনা হিসাবে এটি আত্মপ্রকাশ করে। তখন থেকে শুরু করে নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি পর্যন্ত এটি বাংলাদেশের প্রধান জনপ্রিয় পত্রিকা হিসাবে চালু ছিল। আলমগীর রহমান, শাহরিয়ার কবির, শাহাদাত চৌধুরী ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষক আতিকুর রহমান প্রমুখ সাংবাদিক এই পত্রিকার সাথে জড়িত ছিলেন।
স্বাধীনতার পর প্রথম সাপ্তাহিক পত্রিকার নাম ‘বিচিত্রা’। এটিই সম্ভবত ম্যাগাজিন আকারে বাংলায় প্রথম প্রফেশনাল ও বাণিজ্যিক সাপ্তাহিক প্রকাশনা। দুই রঙের প্রচ্ছদ ও ভেতরে সাদাকালো পত্রিকা। ১৯৭২ সালের ১৮ মে বিচিত্রার প্রথম সংখ্যা প্রকাশিত হয়। প্রথম সংখ্যার প্রচ্ছদ শিরোনাম ‘শেখ মুজিব নতুন সংগ্রাম’। ভেতরে সমাজ ও রাজনীতি নিয়ে প্রচ্ছদ কাহিনী ও প্রতিবেদন থাকলেও দ্বিতীয় সংখ্যা থেকে পত্রিকাটি রম্য রূপ ধারণ করে। বিচিত্রার শুরুর কয়েক মাসে ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে নারীর মুখ প্রচ্ছদে আনা হয়েছিল। বিষয় ছিল যেমন ‘হাসি হাসি এবং; বিয়ে একটি সনাতন প্রথা; ঢাকার বিজ্ঞাপনে মডেল; আপনি বিমানবালা হতে চান?’ ইত্যাদি। তবে বিচিত্রার এই রম্য রূপ বেশি দিন থাকেনি। মুক্তিযুদ্ধফেরত সৈনিকদের হাতে কলম হয়ে উঠেছিল শাণিত অস্ত্র। বছর ঘুরে যেতে না যেতেই এটি সমসাময়িক রাজনৈতিক ও সামাজিক ঘটনাবলির বিশ্লেষণাত্মক ম্যাগাজিনে পরিণত হয়। বিচিত্রা ‘কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স নিউজ অ্যান্ড ভিউজ’ ম্যাগাজিন হয়ে উঠল। একসময় অনেকের কাছে আরাধ্য এই সাপ্তাহিকটি স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের ম্যাগাজিন সাংবাদিকতায় একটি নতুন ধারা তৈরি করেছে। এ পত্রিকার ফোকাস হয়ে উঠেছে সাত দিনের বাংলাদেশ, সঙ্গে চলমান বিশ্বের চিত্র।
বিভিন্ন সময়ের সম্পাদক:
১৯৭২ সালের ১৮ মে সাপ্তাহিক বিচিত্রার ১ম বর্ষ, প্রথম সংখ্যার আত্মপ্রকাশ ঘটে। প্রথমে এটির সম্পাদক ছিলেন ফজল শাহাবুদ্দীন।[ সহকারী সম্পাদক ছিলেন শাহাদাত চৌধুরী। শিল্প সম্পাদক ছিলেন কালাম মাহমুদ। সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি ছিলেন হাসান হাফিজুর রহমান। সম্পাদকীয় সহকারী ছিলেন আহরার আহমেদ এবং শাহরিয়ার কবির। এর পরে নুরুল ইসলাম পাটোয়ারী সাপ্তাহিক বিচিত্রার সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। শাহাদত চৌধুরী এই পত্রিকার সম্পাদকের দায়িত্বভার গ্রহণ করেন অনেক পরে। শামসুর রাহমান ১৯৭৭ থেকে ১৯৮৭ পর্যন্ত দীর্ঘ দশ বছর এই পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন। শুরু থেকেই এই পত্রিকাটি পাঠকের মন জয় করে নেয়, এর অনুসন্ধানী প্রতিবেদনগুলোর মধ্য দিয়ে।
জনপ্রিয়তা:
তৎকালীন সময়ে সাপ্তাহিক বিচিত্রার প্রচারসংখ্যা সর্বাধিকপর্যায়ে পৌঁছেছিল। এটির প্রচারসংখ্যা প্রায় ৭০ হাজারে পৌঁছে। বিচিত্রা সচিত্র সন্ধানী বাংলাদেশে সর্বপ্রথম প্রতি বছর ঈদ সংখ্যায় উপন্যাস প্রকাশ আরম্ভ করে। ঈদ সংখ্যায় ছয়-সাতটি উপন্যাস প্রকাশিত হতো। স্বল্পমূল্যে প্রকাশিত উপন্যাস পড়ার এই সুযোগ জনপ্রিয়তা পায়। তরুণ হুমায়ূন আহমেদের ‘নন্দিত নরেক’ উপন্যাস সাপ্তাহিক বিচিত্রার ঈদ সংখ্যায় প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল। সৈয়দ শামসুল হক, হুমায়ূন আহমেদ, ইমদাদুল হক মিলন, রাহাত খান, রিজিয়া রহমান, মঈনুল আহসান সাবের, সেলিনা হোসেনের মতো ঔপন্যাসিকদের উপন্যাস পড়ার সুযোগ পেত পাঠকরা। শাহেদ আলীর ‘শা’নজর’, সৈয়দ শামসুল হকের ‘নিষিদ্ধ লোবান’, রিজিয়া রহমানের ‘রক্তের অক্ষর’ উপন্যাস বিচিত্রা প্রকাশের পর সাড়া জাগিয়েছিল। রাজশাহীর বিশ্ববিদ্যালয়ের চাঞ্চল্যকর নীহার বানু হত্যাকাণ্ড সংক্রান্ত সংখ্যাটি ৭৫ হাজার কপি ছাপা হয়েছিল। শিল্পী রফিকুন নবীর ‘টোকাই’ কার্টুন ছিল বিচিত্রার অন্যতম আকর্ষণ। প্রতিবছর ৩১ ডিসেম্বর রাতে শাহদত চৌধুরীর হাটখোলাস্থ পৈতৃক বাসভবনে এক পার্টির আয়োজন করা হতো। সাপ্তাহিক বিচিত্রা ও আনন্দ বিচিত্রা ছাড়াও দেশের সেরা বুদ্ধিজীবী, লেখক, কবি, সাংবাদিক, সাহিত্যিক, অভিনেতা, অভিনেত্রী, রাজনীতিবিদ এবং বিদেশী কূটনীতিকদের বিপুল সম্মিলন ঘটত। এটা বিচিত্রা পত্রিকার সফল জনসংযোগ ‘কর্মসূচি’ হিসেবে বিবেচিত হতো।
বিচিত্রা ও আনন্দ বিচিত্রার সাংবাদিক ও সম্পাদকীয় বিভাগে যারা ছিলেন তারা হলেন- শাহরিয়ার কবির, মাহফুজউল্লাহ, মঈনুল আহসান সাবের, সাজ্জাদ কাদির, চন্দন সরকার, কাজী জাওয়াদ, আবদুল হাই শিকদার, আসিফ নজরুল, সেলিম ওমরাও খান, আশরাফ কায়সার, মাহমুদ শফিক, চিন্ময় মুৎসুদ্দী, শামীম আজাদ, অরুণ চৌধুরী, মাহমুদা চৌধুরী, আকবর হায়দার কিরণ, কবিতা হায়দার, মিনার মাহমুদ, ইরাজ আহমেদ, শিল্পী মাসুক হেলাল, ফটোগ্রাফার শামসুল ইসলাম আলমাজী, রফিকুর রহমান রেকু প্রমুখ।
বিভিন্ন প্রতিবেদন:
সম্পাদক শাহাদাত চৌধুরীর উদ্যোগে বিচিত্রার বিভিন্ন অভিনব প্রতিবেদন জনপ্রিয়তা লাভ করে। বিচিত্রা প্রতি সংখ্যায় একটি করে প্রচ্ছদ প্রতিবেদন প্রকাশ করতো। ১৯৭২ সালের ১৮ মে প্রকাশিত প্রথম সংখ্যার প্রচ্ছদ প্রতিবেদন ছিল ‘শেখ মুজিব নতুন সংগ্রাম’। ১৯৭৮ সালে অ্যাবর্শনের পক্ষে প্রচ্ছদ করে বিচিত্রা।
সময়ের চেয়ে এগিয়ে থেকে বিচিত্রা নারীর ছবি দিয়ে প্রচ্ছদ করে ‘বিয়ে একটি সনাতন প্রথা’। স্বাধীনতার পর প্রথম গণপিটুনিতে নিহত যুবককে নিয়ে বিচিত্রা প্রচ্ছদ করে। বিমানবালা, ছেলেদের চোখে মেয়েরা, মেয়েদের চোখে ছেলেরা, বেদের জীবন, শিশু পাচার, বেলী ফুলের বিয়ে, হাসি নিয়েও প্রচ্ছদ করেছে বিচিত্রা।
১৯৭৩ সালে বিচিত্রার বছরের আলোচিত চরিত্র ছিল ‘আততায়ী’। ১৯৭৪ সালের আলোচিত চরিত্র ছিল ‘স্মাগলার’। সজীব সচল বাংলাদেশের স্থির প্রতিকৃতি শিরোনামে ‘বর্ষপঞ্জী’ প্রকাশ করেছে প্রতি বছর। চিঠিপত্র, ব্যক্তিগত বিজ্ঞাপনও ছিল বিচিত্রার আলোচিত বিষয়।
বিচিত্রা দেশে প্রথম আরম্ভ করে ঈদ ফ্যাশন প্রতিযোগিতা। নির্বাচিত পোশাক মডেলদের পরিয়ে, ছবি তুলে অ্যালবাম প্রকাশ করতে শুরু করে বিচিত্রা। সামাজিক অচলায়তন ভেঙে নারীদের সামনে নিয়ে আসার উদ্যোগ নিয়ে বিচিত্রা ফটো সুন্দরী প্রতিযোগিতার আয়োজন করে।
১৯৭৪ সালে ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী ও গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রকে নিয়ে বিচিত্রার প্রচ্ছদ করে ‘একটি স্বপ্ন একটি প্রকল্প’ শিরোনামে। ‘মাটি ও মানুষ’ খ্যাত তখনকার তরুণ শাইখ সিরাজকে নিয়ে প্রচ্ছদ করে বিচিত্রা। ড. মুহাম্মদ ইউনূস, স্যার ফজলে হাসান আবেদের সুখ্যাতি দেশে-বিদেশে ছড়িয়ে পড়ার আগেই তাদেরকে বিচিত্রার প্রচ্ছদে দেখা যায়। বিচিত্রার সাংবাদিকরাই প্রথম সরেজমিন ঘুরে ঘুরে যুদ্ধাপরাধীদের তথ্য সংগ্রহ করে। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের সময় গুরুত্বপূর্ণ তথ্য-আলামত হিসেবে যা কাজে লাগে। সাতজন বীরশ্রেষ্ঠ’র তথ্য ও ছবি সংগ্রহ, শিল্পী সমন্বয়ে অঙ্কন ও প্রকাশ করে বিচিত্রা।
বিচিত্রার খুব সমৃদ্ধ একটি লাইব্রেরি ছিল। এনসাইক্লোপিডিয়া থেকে শুরু করে পৃথিবীর বহু গুরুত্বপূর্ণ বই ছিল বিচিত্রার সংগ্রহে।মুক্তিযোদ্ধাদের বীরত্বের ঘটনা প্রায় প্রতি সপ্তাহে প্রকাশিত হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ সামনে রেখে যুদ্ধের স্মৃতিচারণা উঠে এসেছে যোদ্ধাদের কলমে ও সাক্ষাৎকারে। যুদ্ধাপরাধীদের শনাক্ত করে প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়েছে। ‘গোলাম আযম ও জামাতের রাজনীতি’ শীর্ষক প্রচ্ছদ কাহিনী এবং এতে প্রকাশিত গোলাম আযমের সাক্ষাৎকারের বক্তব্য ‘একাত্তরে আমরা ভুল করিনি’ সারা দেশে প্রতিবাদের ঝড় তুলেছে এবং রাজনীতিতেও নতুন মেরুকরণ তৈরি করেছে। দুর্নীতি, চোরাচালান, শিশু পাচার, নারী অধিকার ইত্যাদি বিষয়ে বিচিত্রার একের পর এক প্রচ্ছদ কাহিনী সমাজের ভিত্তিমূলে নাড়া দিয়েছে।
অবলুপ্তির কারণ:
১৯৯৬ সালে দৈনিক বাংলা সহ বিচিত্রার মালিকানা বদল হয়। পরে বিচিত্রার জনপ্রিয়তা কমে গেলে পত্রিকাটি বন্ধ করে দেয়া হয়।
আরো দেখা যেতে পারেঃ
শাহাদাত চৌধুরী https://web.facebook.com/abmb.rashid/posts/1755350887959569
তথ্যসূত্র:
১. কালের কণ্ঠ ১২ জানুয়ারি ২০১৭
২. দৈনিক বাংলা ও বিচিত্রা’র সেই সম্পদগুলো কোথায়?, নয়া দিগন্ত, ১২ নভেম্বর ২০১৭
৩. শাহাদত চৌধুরী, একজন সম্পাদক একজন মুক্তিযোদ্ধা, ডেইলি স্টার, ২৮ জুলাই ২০২০
৪. নতুন ধারা তৈরি করেছে ‘বিচিত্রা’, কালের কণ্ঠ, ১২ জানুয়ারি ২০১৭
লেখক: রূপম রশীদ, শিক্ষক, গাইবান্ধা।ইমেইল: abmbrashid@gmail.com

শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর

© ২০২১ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত | সাপ্তাহিক দারিয়াপুর

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com