রবিবার, ২৮ নভেম্বর ২০২১, ০২:২৬ পূর্বাহ্ন
শিরোনাম :
গাইবান্ধা জেলা শিল্পকলা একাডেমীর নির্বাচন সম্পন্ন গাইবান্ধায় যুব ইউনিয়নের জেলা সম্মেলন অনুষ্ঠিত মিথ্যা মামলা প্রত্যাহারের দাবিতে গাইবান্ধায় সিপিবির বিক্ষোভ মিছিল প্রেসক্লাব গাইবান্ধার অভিষেক ও প্রীতিভোজ অনুষ্ঠিত গাইবান্ধায় পুলিশে নিয়োগ পরীক্ষার ফল প্রকাশ খালেদা জিয়ার নিঃশর্ত মুক্তি এবং চিকিৎসার দাবিতে বিক্ষোভ গাইবান্ধায় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকদের মাসিক সমন্বয় সভা অনুষ্ঠিত মহান রুশ বিপ্লব ও পার্টির ৪১তম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীর ডাক মামলা প্রত্যাহারের দাবিতে গাইবান্ধায় কমিউনিস্ট পার্টি বিক্ষোভ গোবিন্দগঞ্জ সড়কে সকালেই প্রাণগেল ৬ জনের

পথ নাটকের ইতিবৃত্ত

রূপম রশীদ
  • প্রকাশের সময় : বৃহস্পতিবার, ১২ আগস্ট, ২০২১
  • ৭৮৮
পথনাটক প্রসেনিয়াম আর্চের বাইরে পথে-প্রান্তরে অর্থাৎ উন্মুক্ত স্থানে অভিনীত নাটক। বস্তুত নাট্যশালার প্রদর্শনীর একটি রুপ হলো পথনাটক এবং কোনো নির্দিষ্ট দর্শক ছাড়া বাহিরে সর্বসাধারণের চলাচলের স্থানে উপস্থাপনাকে বোঝানো হয়। বাঙলা পথনাটক (Street Theatre) বামপন্থী (Leftist) সংস্কৃতির অবদান চারের দশকের মাঝামাঝি কমিউনিস্ট পার্টির হাত ধরে প্রথমে পানু পাল পথনাটকের বীজ পুঁতেছিলেন বলাযায়। পরে তা ডালপালা মেলে ধরেছিল উৎপল দত্ত -এর হাত ধরে। পথনাটক বিভিন্ন জায়গায় হতে পারে। যেমন: শপিং সেন্টার, গাড়ি পার্ক, বিনোদনমূলক স্থানে, কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস আর রাস্তার পাশে। এমনটা বিশেষত বিপুল পরিমাণ জনবহুলপূর্ণ খোলা জায়গায় দেখতে পাওয়া যায়। পথ-অভিনেতা থেকে শুরু করে সংগঠিত নাট্যশালা কোম্পানি বা বিভিন্ন শ্রেণী যারা প্রদর্শনীর জায়গা নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে ইচ্ছুক অথবা যারা তাদের সাধারণ কাজক্রম উন্নীত করতে চায় তারা এখানে অভিনয় করেন। উন্মুক্ত স্থানে নাটকগুলি অভিনীত হয় বলে এগুলির দর্শকরা হয় সাধারণ শ্রেণীর। নিতান্তই অনাড়ম্বরভাবে শিল্পীরা অভিনয় করেন এবং দর্শকরা মাটিতে বসে বা দাঁড়িয়ে অভিনয় উপভোগ করেন। অভিনেতা-অভিনেত্রী ও দর্শকদের মধ্যে এই সরাসরি সংযোগের কারণে পথনাটকের অভিনয় অনেকটা দুরূহ; এতে পর্যাপ্ত অভিজ্ঞতা ও দক্ষতার প্রয়োজন হয়। পথনাটক একসময় একটি তথ্য প্রদানের উৎস ছিল যখন তথ্য প্রদানের জন্য অন্য কোনো উৎস যেমন: টেলিভিশন, রেডিও ইত্যাদি ছিল না। বর্তমানে পথ নাটকের দর্শকদের জন্য এটি একটি বার্তা বহন করে। মাইক্রোফোন বা লাউডস্পিকার না থাকার কারণে পথ নাটককে অভিনয়ের সর্বনিম্ন রূপ হিসেবে ধরা হয়।
পথনাটকের সময়সীমা হয় মঞ্চনাটকের চেয়ে কম, সাধারণত আধ ঘণ্টা থেকে এক ঘণ্টা। স্বল্পদৈর্ঘ্য এই নাটকের মুখ্য উদ্দেশ্য বিনোদন নয়; জনসাধারণের মধ্যে সামাজিক সচেতনতা সৃষ্টি, অন্যায়-অবিচারের প্রতিবাদ করা এবং কুসংস্কারবিরোধী আন্দোলন এর প্রধান লক্ষ্য। হাটে-বাজারে, পথে-ঘাটে কোনরূপ মঞ্চব্যবস্থা ছাড়াই সমাজে বিরাজমান যেকোনো সমস্যা অভিনয়ের মাধ্যমে তুলে ধরা হয় এবং ক্ষেত্রবিশেষে তার সমাধানও নির্দেশ করা হয়। কখনো কখনো এ ধরনের প্রদর্শনী লাভজনক যেমন, পথে অনুস্থিত মেলা, শিশু প্রদর্শনী এবং প্যারেডে কিস্তু, সাধারণত পথ নাটকের অভিনেতারা বিনা মূল্যে প্রদর্শনী করেন অথবা তাদের টুপিতে ধাতব মূদ্রা নেওয়ার মাধ্যমে রোজগার করেন।
পথনাটকের জন্য সাধারণ পোশাক এবং সাজসরঞ্জামই যথেষ্ট। কখনো কখনো অভিনেতার শারীরিক সক্ষমতার ও কণ্ঠস্বরের উপর নির্ভর করে হালকা সাউন্ড অ্যাম্পলিফিকেশন প্রয়োজন হতে বা নাও হতে পারে। সাউন্ডের এই সমস্যাটি খোলা স্থানে ফিজিক্যাল থিয়েটার ধারাটিকে খুবই জনপ্রিয় করে তুলেছে। দর্শকদের আকৃষ্ট করতে প্রদশর্নীগুলো অকশ্যই প্রকটভাবে দৃশ্যমান হতে হয়, শোনার উপযোগী এবং অনুশীলনে সহজ হতে হয়।
পথনাটক অবশ্যই উদ্যান বা মাঠ সহ বিভিন্ন খোল স্থানে আনুষ্ঠানিকভাবে আয়োজিত অন্যান্য মঞ্চ প্রদর্শনী, যেগুলোতে নির্ধারিত স্থান (দড়ি দিয়ে ঘেরা) থাকে এবং তা উপভোগ টিকেট প্রয়োজন হয় সেগুলো থেকে আলাদা হওয়া উচিত।
অনেক সময় পথনাটক প্রদর্শনী করতে স্থানীয় বা কেন্দ্রীয় শাসনবিভাগের অনুমতি প্রয়োজন হয়। আবার অনেকেই ইচ্ছানুযায়ী করে।
পথনাটককে মঞ্চ প্রদর্শনীর সবচেয়ে আদি রূপ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ধর্মীয় নাটক সহ বেশিরভাগ সাধারণ বিনোদন মাধ্যমের সূত্রপাত হয় পথনাটক থেকে। অতি সাম্প্রতি কালের প্রদর্শকেরা, যারা, এক হাজার বছর আগে হলে হয়তো বিভিন্ন মঞ্চে, মিউজিক হোল এবং বিচিত্রানুষ্ঠানে প্রদর্শনী করত, দারা এখন প্রায়ই পেশাগতভাবে পৃথিবীর জুড়ে বিখ্যাত পথ প্রদর্শনীর স্থানে প্রদর্শনী করে। রবিন উইলিয়ামস,, ডেভিড বোয়ি, জুয়েল এবং হেরি এন্ডারসন সহ আরো অনেকে অনেক উল্লেখযোগ্য ব্যক্তি তাদের কর্মজীবন পথ প্রদর্শনীর মাধ্যমে শুরু করেন।
পথনাটক এমন মানুষকেও প্রদর্শনী করার সুযোগ দেয় যারা কখনো সাধারণ মঞ্চে উঠে প্রদর্শনী করতে পারেনি বা তা করার সার্মথ্য অর্জন করতে পারেনি। যে কোনো ব্যাক্তি এই প্রর্দশনী চাইলেই দেখতে পারে এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এই প্রদর্শনীগুলো বিনামূল্যে বিনোদন হিসেবে করা হয়।
রাস্তায় প্রদর্শনী করার কারণ:
প্রদর্শনী কর্মীরা সামাজিক উদ্দীপনা লাভের উদ্দেশ্যে অনেক মানুষেরসোথে সরাসরি সম্মুখীন হওয়া বা জড়িত হওয়ার জন্য প্রায়ই তারা তাদের বৃত্তি রাস্তায় প্রদর্শন করে থাকেন। উদাহরণস্বরুপ, মাল্টিমিডিয়া শিল্পী সিজার পিঙ্ক এবং দার জনপ্রিয় প্রদর্শনীর দল দ্যা ইমপেরিয়াল ওর্জি এ ধরনের একটি প্রদর্শনী নিউইর্য়কের অর্থনৈতিক বিভাগ এর রাস্তায় প্রদর্শনী করে, যার নাম ছিল “আউয়রে ডেইলি ব্রেড”। এ প্রদর্শনীর সময় তারা সাড়ম্বরে ফুটপাতে ওয়ান্ডার ব্রেড পাউরুটি দিচ্ছিল। প্রতিটি পাউরুটি একটি বিজ্ঞাপনের সাথে দেওয়া হয়েছিল, সেই বিজ্ঞাপনের দেখানো হয়েছিল যে, শয়তান মানুষের আত্মা ধাতু নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতার বিনিময়ে কেনার প্রস্তাব করছে। যখন পুলিশ এবং তাদের বোমা অনুসন্ধানকারী কুকুর পাউরুটিগুলোতে কোনো বিস্ফোরক আছে কিনা তা দেখতে আসলে একটি অস্থিতিকর পরিবেশ বিরাজ করে।
অন্য শিল্পীগণ মনে করেন যে ধরনের মানুষের সাথে তারা যোগাযোগ করতে চান অর্থ প্রদানের মাধ্যমে প্রদর্শনীতে উপস্থিত হওয়া মানুষেরা তাদের প্রতিনিধিত্ব করে না, তাই রাস্তায় পথচারীদের মাঝে প্রদর্শনী করা প্রচারণার আরও জনপ্রিয় পদ্ধতি।
কিছু সমসাময়িক পথ নাটক অনুশীলনকারী বহু পুরানো রাস্তা এবং প্রদর্শনী প্রথা চর্চা করেন, যেমন: কার্নিভাল এবং কমডিয়া ডেল’আরতে। তারা সেগুলোকে তাদের মূল বিষয়ের সংঙ্গতিপূর্ণ পরিবেশে উপস্থাপন করার চেষ্টা করে।
রাস্তাকে প্রদর্শনীর স্থান হিসেবে বেছে নেওয়ার কারণ যাই হোক না কেন, রাস্তায় সাধারণ প্রদর্শনী মঞ্চের থেকে ভিন্ন সম্ভাবনা বিদ্যমান। ওয়েলফেয়ার স্টেট ইন্টারন্যাশনালের সিউ গিল যুক্তি দেন যে, কোনো পথনাটক প্রদর্শনী কোনো আভ্যন্তরীন প্রদর্শনীর চেয়ে ছোট পদ্ধতি নয়, এমনকি এটি মানুষ মঞ্চে করে তাও বাহিরে নিয়ে যায় না বরং নিজস্বতা এবং নিজস্ব উদ্দমসম্পন্ন একটি রূপ।
অনেক সংগঠন আবার রাজনৈতিক সুবিধার্থে পথ নাটকে প্রাতবাদমূলক প্রদর্শনী করে। এই ব্যাপারটি সান ফ্রান্সিস্কো মাইম ট্রিপ, দ্যা লিভিং থিয়েটার এবং ব্রেড এন্ড পাপেট থিয়েটার এর কার্নিভালাস্ক প্যারেড এবং আশিশ মোল্লা এবং নেপালের সর্বনাম থিয়েটার এর গেরিলা থিয়েটার পদ্ধতির মাধ্যমে উত্থাপিত হয়।
লুমিয়ারে এন্ড সন, জন বুল পাঙ্কচার রিপেয়ার কীট, এক্সপ্লোডেড আই এবং সাধারণ থিয়েটার কোম্পানীগুলো ১৯৬০-৭০ এ একটি মানসম্মতপিথ নাটক তৈরি করে। পথ নাটকটি অঘোষিত ছিল, তবে অভিনেতারা সোন্দর্য প্রদর্শন বা পরাবাস্তব অথবা শুধু পথচারীদের জড়িত করেই আগে থেকে ঠিক করা দৃশ্যকল্পে অভিনয় করেন। তারা কেনডিড ক্যামেরার মতো কোনো জালাকি করতে চায় নি বরং তারা দর্শক আমন্ত্রণ করে তাদের মধ্যে অভিনয় করেছিলেন। কোনো পরিমান পরিকল্পনা এবং অনুশীলন এটি ঘটাতে পারত না।
আরেকটি উদাহরণ নেচারাল থিয়েটারের “পিঙ্ক সুটকেস” হতে পারে। এই পথ নাটকে, এক দল পরিপাটিভাবে পোশাক পড়ে থাকা মানুষ বিভিন্ন রাস্তায় বা ভবনে একটি গোলাপি সুটকেস নিয়ে প্রবেশ করে। তারা তাদের সঙ্গীদের খুজে এবং হারিয়ে ফেলে। অনুসন্ধানের সময় তারা বাসে উঠে, শিলাবৃষ্টি হয় এবং দোকানের জানালায় আটকে পড়ার মতো বিভিন্ন ঘটনা তাদের সাথে ঘটে। যখন তারা পথচারীদের সাহায্যে একটি পূর্ব নির্ধারিত স্থানে মিলিত হয় তখন স্থানটির পরিবেশ বদলে যায় এবং কেনাবেচা কিছুক্ষণের জন্য হলেও বন্ধ হয়ে যায়। এই অনুভূতিটি সার্বজনীন এবং এটি সত্তরটি দেখানো হয়েছে। এ ধরনের প্রদর্শনী সাধারণত চার বা পাঁচ জন অভিনেতা নিয়ে করা হয় কিন্তু এটি ২৫ জন অভিনেতা নিয়ে করা হয়েছে।
বাংলাদেশে পথ নাটকের পটভূমি:
ভারতীয় গণনাট্য সংঘের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা পূর্ণেন্দু শেখর পাল বা পানু পালই (জন্ম: ২০ জানুয়ারি, ১৯১৯ বাংলাদেশের গাইবান্ধায় মৃত্যু: ২ সেপ্টেম্বর, ১৯৯৫ ভারতের পশ্চিম বঙ্গে ) হলেন উপমহাদেশে বাঙলা পথনাটকের প্রবর্তক।পানুপালের “হাঙ্গার এন্ড ডেথ”, একটি মাইলস্টোন একটা বিখ্যাত সৃষ্টি আইপিটিএ যুগের। রংপুরের শ্রীমতী রায়চৌধুরী পানু পালের সঙ্গে নাচতেন নৃত্যনাট্যটিতে। এই নৃত্যনাট্যে পানু পাল হতেন ডেথ আর শ্রীমতি রায়চৌধুরী হতেন হাঙ্গার। কথিত আছে গ্রামেগঞ্জে, এই নৃত্যনাট্য দেখে স্থানীয় জনগণ তাদের যা কিছু আছে চাল-ডাল তাদের গায়ের সামান্য গয়না সমস্ত খুলে পার্টি কমরেডদের হাতে তুলে দিতেন। নৃত্যনাট্য দেখার পরে হাপুস নয়নে কেঁদেছিলেন সরোজিনী নাইডু, পানু পাল স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছিলেন। তেতাল্লিশের মন্বনতরের উপরে ওখানে এটি তৈরি হয়েছিল, করেছিল পানু পাল।
পানু পানু অন্যত্র বলেছেন, “একবার তো অতি উৎসাহের আতিশয্যে গায়ের জামাটা পুড়িয়ে ফেলেছিলাম বিদেশি বস্ত্র পেড়ানোর আন্দোলনে। বাড়ি ফিরে খুব ভয়ে ভয়ে ব্যাপারটা বাবাকে জানাতেই বাবা বললেন সব ঠিক আছে তবে একটা গণ্ডগোল হয়ে গেছে জামাটা বিদেশি কাপড়ের ছিল না। এই ছিল আমার বাবা, আমার জীবনের সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা। বাবার ছিল নাচ, গান ইত্যাদিতে প্রবল উৎসাহ যদিও ঠাকুরদার ছিল ভীষণ আপত্তি। ছোটবেলা থেকেই তাই অবচেতনেই চলছিল একদিকে রাজনৈতিক চেতনার বিকাশ অন্যদিকে সাংস্কৃতিক মননশীলতার চর্চা।”
পানু পাল শুধু বাংলা পথনাটকের পথিকৃত নয়, একই সঙ্গে সারা ভারতের পথনাটকেরও পথ প্রদর্শক। প্রসেনিয়ামের বাধা অতিক্রম করে তিনি নাটককে নিয়ে খোলা আকাশের নিচে উন্মুক্ত জায়গায়। মার্কসীয় আদর্শকে বুকে নিয়ে তিনি বঞ্চিত, নিপীড়িত মানুষের কথা বলতেন তার নাটকের মধ্য দিয়ে।
পথ নাটক বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আগে থেকেই প্রচলিত ছিল এবং আছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে এবং পরবর্তী সময়ে ভারতবর্ষে দুর্ভিক্ষ, নিপীড়ন ও নির্যাতন প্রতিরোধ এবং কালোবাজারি ও মুনাফাখোরদের বিরুদ্ধে জনগণকে প্রতিবাদী করতে এবং ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে জনগণকে স্বাধীনতার জন্য একত্র করতে পানু পাল এবং ভারতীয় গণনাট্য সংঘের পথনাট্যচর্চার বিশেষ অবদান ছিল। পরবর্তীতে, শ্রমজীবী মানুষের অধিকার আদায়ের আন্দোলনে পথনাটক একটি সফল ও শক্তিশালী মাধ্যম হিসেবে আয়োজন করা হয়। উৎপত্তি, বিকাশ ও চর্চার ইতিহাসে মূলত ঐতিহ্যবাহী লোকসঙ্গিত, লোকনৃত্য ও লোকনাট্যের প্রভাব লক্ষণীয়। অনেক সময় আগে থেকেই গ্রামবাংলার পূজা-পার্বণ, মেলা, উৎসব ইত্যাদিকে কেন্দ্র করে খোলা জায়গায় পথ নাটক আয়োজিত হতো, যা বর্তমান পথ নাটকের কাঠামো নির্মানে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলেছে।
স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে গ্রুপ মঞ্চভিত্তিক নাট্যচর্চা শুরু হওয়ার পর মঞ্চনাটকের পাশাপাশি পথ নাটক প্রদর্শনকারী দলগুলোও অগ্রসর হয়। ১৯৭৭ সালে, ঢাকা থিয়েটার সেলিম আল-দীন রচিত “চর কাঁকড়ার ডকুমেন্টারী” নামে ঢাকায় প্রথম পথ নাটকের প্রদর্শনী করে। এস.এম সোলায়মান রচিত মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক পথ নাটক “ক্ষ্যাপা পাগলার প্যাঁচাল” পদাতিক নাট্য সংসদ ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় প্রদর্শন করে। পরবর্তীতে ঢাকা পদাতিকও এই নাটকটির প্রদর্শনী করে। নাটক প্রায় চারশো বার মঞ্চায়ন করা হয়।
বাংলাদেশে পথ নাটক অনুশীলনে চারণ নাট্যগোষ্ঠীও গুরুদ্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
বালোদেশ গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশন আশির দশকে পথনাটক উৎসব পালন করার উদ্যোগ নেয়। ১৯৮৭ সালে, ঢাকার নাট্যদল মহাকাল, সুবচন, গণছায়া, মহানগরী ’৭৭ সম্মিলিতভাবে নিয়মিত পথনাটক প্রদর্শনী করার উদ্যোগ গ্রহণ করে। তখন ঢাকা মহানগর ও সিলেটের একটিসহ মোট ২৫টি নাট্যদল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে সাতদিনব্যাপী পথনাটক প্রদর্শনীতে অংশ গ্রহণ করে। পরে ঢাকার মোহাম্মদপুরে ২১টি নাট্যদল সপ্তাহব্যাপী পথনাটক প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত করে। ১৯৯২ সালে, পথ নাটক চর্চার গতিকে আরও বেগবান করতে মহাকাল, ঢাকা নাট্যম ও দেশ নাটক সম্মিলিতভাবে পথ নাটক প্রদর্শনীর উদ্যোগ গ্রহণ করে। তাদের এই উদ্যোগে ‘বাংলাদেশের পথনাট্যচর্চারত নাট্যদলসমূহ’ শিরোনামে প্রতি শুক্রবার বিকেলে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের প্রবেশপথে পথনাটকের প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়। ১৯৯৩ সালে এগুলোকে কেন্দ্র করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্রে ‘পথনাটক পরিষদ’ প্রতিষ্ঠিত হয়। পরবর্তী সময়ে প্রতিবছর শীতকালে পথনাটক প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়। ১৯৯৬ সালের ১-৭ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশন ও বাংলাদেশ পথনাটক পরিষদের সম্মিলিত উদ্যোগে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের পাদদেশে “মুক্তিযুদ্ধের ২৫ বছর” শীর্ষক সপ্তাহব্যাপী নবম জাতীয় পথনাটক উৎসব অনুষ্ঠিত হয়। ১৯৯৯ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের প্রথম সপ্তাহে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে “মঞ্চে ও পথে অধিকার চাই” শীর্ষক দ্বাদশ জাতীয় সপ্তাহব্যাপী পথনাটক উৎসব অনুষ্ঠিত হয়। এই উৎসবে বাংলাদেশের ২৩টি নাট্যদল অংশগ্রহণ করে। উৎসবে প্রদর্শিত নাটকগুলির মূল বিষয়বস্তু ছিল মুক্তিযুদ্ধ এবং অসম্প্রদায়িক চেতনা। পথনাটক পরিষদের এককভাবে ২০০০ সালের ২৫-২৯ ফেব্রুয়ারিতে প্রথম পথনাটক উৎসব অনুষ্ঠিত করে। বিভিন্ন জাতীয় দিবস কে কেন্দ্র করে দেশের বিভিন্ন জায়গায় এবং মে দিবসে শিল্পাঞ্চলে পথ নাটক প্রদর্শনী করা হয়।
তথ্যসূত্র
১) বাংলাদেশের পথ নাটক by ড. ইসরাফিল শাহীন
২) পথনাটককে পোস্টার ড্রামা বলতে আমি রাজি নই – বলেছিলেন পথনাটকেরই জনক পানু পাল -তাঁর নাতনী মধুমিতা পাল -এর লেখা নাট্যমেব জয়তে পত্রিকা
৩) Robin Williams began his career on the streets of San Francisco as a street performer: https://movies.yahoo.com/movie/contributor/1800013042/bio
৪) Coult, Tony; Kershaw, Baz, সম্পাদকগণ (১৯৮৩)। Engineers of the Imagination: The Welfare State Handbook। Methuen। আইএসবিএন 0-413-52800-6।
৫) Doyle, Michael William (২০০১)। Imagine Nation: The American Counterculture of the ’60s and ’70s ।
লেখক: শিক্ষক, গাইবান্ধা। email: abmbrashid@gmail.com

শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর

© ২০২১ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত | সাপ্তাহিক দারিয়াপুর

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com